নজির আহমদ
ইচ্ছে হল হাত নিয়ে কিছু লিখি। হাত নিয়ে লেখার যে ইচ্ছে এর ভ্রণ সৃষ্টি হয়েছিল অনেক-অনেক বছর আগে। এত বছর ধরে ভ্রণটা জঠরে বড় হচ্ছিল। ইচ্ছেটা পরিপক্কতা লাভ করে আজই ভূমিষ্ঠ হল। আজ আর না লিখে থাকতে পারছি না, লিখতে বাধ্য হচ্ছি।
সহৃদয় পাঠকদের অনেকেই ভাবতে পারেন- হাত নিয়ে লেখার মত কী আছে। হাত তো হাতই। এটি মানব দেহের একটি প্রয়োজনীয় অঙ্গ। হাতের যে কতো কাজ তা লিখে শেষ করা যাবে না। দেহের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মত এসব উপযোগিতা হচ্ছে হাতের জৈবিক দিক। হাতের উপকারিতা বা অপকারিতা সম্পর্কে রচনা লেখার কোন ইচ্ছে আমার নেই। লেখার ইচ্ছে হচ্ছে হাতের নান্দনিক দিক নিয়ে। স্নেহময়ী জননীয় যখন শিশুকে বুকে জড়িয়ে স-ন্য পান করান, কিংবা দু’হাতে দোল খাইয়ে ঘুম পাড়ান মায়ের মঙ্গলহাত শিশুকে স্নেহরসে সিক্ত করে- এসব ক্ষেত্রে যে দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যাবলী উদ্ভাসিত হয় তা শুধু জৈবিক কর্মকান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, জৈবিক কর্মকান্ডের বাইরেও সেখানে এক অনির্র্বচনীয় সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। নারী যখন তার প্রিয়তমাকে কিংবা পুরুষ যখন তার প্রিয়তমাকে বাহুডোরে বন্দী করে আদিম আনন্দে মত্ত হয়, এরূপ হাতগুলোকে হয়ে ওঠে, দৃষ্টি নন্দন দৃশ্যসৃষ্টি করে, আমরা তখন আনন্দলোকে হারিয়ে যাই।
কিন' ইচ্ছের জন্মকথা তো এখনও বলা হলো না। কীভাবে কখন, কোন পরিসি'তিতে ইচ্ছেটার জন্ম হল সেটা এখনও অব্যক্ত রয়ে গেল। অর্থাৎ আসল কথাটাই বলা হল না।
বহু বছর আগের ঘটনা। তখন আমি ষষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র, কোন এক বসন- দিনে পাশের গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ের উৎসবে গিয়েছিলাম। ঐ সময় বিয়ের উৎসব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির তখনকার উৎসবে ছিল প্রাণপ্রাচুর্য এবং অকৃত্রিম। ১০/১৫ দিন স'ায়ী হতো বিয়ের আনন্দোৎসব। গায়ে হলুদের রাতে প্রায় সারা রাতটাই আনন্দ উৎসবে কেটে গেল। শেষ রাতে যে যেখানে জায়গা পেল সেখানেই শুয়ে পড়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমার যা বয়স তাতে কোথাও ঘুমোতে বাধা নেই। তাই ফাঁকা পেয়ে শুয়ে পড়লাম এক বিছানায়, ঘরের মেঝে পাতানো। ওখানে আরও ৫/৭ জন বালক বালিকা ঘুমাচ্ছিল আগে থেকেই। এতগুলো ছেলে মেয়ের মধ্যে কে কার পরিচয় জানে বা খবর রাখে। ঘুমিয়ে পড়লাম অঘোরে।
বাচ্চা-কাচ্চাদের হৈ হুল্লোড়ে ভোর না হতেই কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভোরের আলো তখনও স্পষ্ট হয়নি। দরজা জানালা সব ছিল খোলা। ঘুমের জড়তা কাটাতে আরো কিছু সময় গেল। উঠে যাবার চেষ্টা করতে দেখি কার যেন লতানো একটি হাত আমার গলায় জড়িয়ে। লক্ষ্য করে দেখলাম- এক কিশোরীর একখানা হাত আমার গলায় পেঁচিয়ে রয়েছে। কিশোরীর দিকে তাকাতেই বুঝলাম সে আমার পরিচিতা, আমরা একই শ্রেণীতে পড়ি। প্রতিদিন তার সাথে আমার দেখা শোনাও কথাবার্তা হয়। কিন' ঐদিন ঐ সময়ে সেভাবে দেখা হলো না। এত কাছ থেকে এমন নিবিড় সান্নিধ্যে এমন অর্ধ আভরণে এবং অর্ধ আবরণে এর আগে কখনও তাকে দেখার সুযোগ হয়নি। নতুন জামা কাপড়, সর্ব শরীরে সুগন্ধি ছড়ানো, ওড়নাটা খসে পড়েছে পাশে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলাম শরীরে তার একটা পরিবর্তন সুষ্পষ্ট। খুব কাছ থেকে না দেখলে এটা বুঝা যায় না। তবে কেন জানিনা অলস জড়ানো আমি তাকে খুঁটে খুঁটে দেখলাম। দেখতে সুন্দর লাগল, ভালো লাগল, শিহরণ সৃষ্টি হল দেহে। এরকম অনুভূতি এর আগে আর কখনও জাগেনি। তার সাথে সম্পর্কের বিষয়টি মনে পড়ল। আলাদা হওয়ার জন্য গলা থেকে তার হাতটি সরিয়ে আলতোভাবে বালিশে রাখতেই আমার দৃষ্টি থমকে দাঁড়াল তার সেই কারুকার্যখচিত হাতে। নাদুস-নুদুস একটি হাত, মেহেদি রাঙ্গা হাতের তালু এবং নখ কাচের চুড়ি পরা। পাঁচটি আঙুল যেন পাঁচটি চাঁপা ফুলের অনাবৃত বোঁটা, মধ্য আঙ্গুলে পাথর বসানো আংটি, পাথরটি চিকচিক করে শিখা ছড়াচ্ছিল।
আরও কয়েক মিনিট আমি হাতটি অবলোকন করেছিলাম। দৃষ্টি আমার অপসারণ করা যায়নি তার হাত থেকে। ভাবলাম, শুধু ভাবলাম একটা হাত কী করে এমন অপরূপ হতে পারে। বিধাতার নিঁখুত শিল্পকর্ম দেখে আবির্ভূত হয়েছিলাম সেই মুহুর্তে।
অতঃপর উঠে এলাম, উঠতে হল। পারিপার্শ্বিকতা আর থাকতে দিল না আমাকে।
এরপর জীবনে অনেক হাত অনেকভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। ঐ হাতটি সারা হৃদয়জুড়ে এমন জেঁকে লেগে আছে যে অন্য আর কোন হাত আমার চাহনিকে ভরে তুলতে পারেনি।
নীরবে নির্জনে সেই হাতটি চোখের সামনে ভেসে উঠে।